প্রশ্নের জবাব লুকিয়ে আছে কাজের ভেতর : বেসিস সভাপতি
সিসটেক ডিজিটাল লিমিটেড প্রতিষ্ঠা এম রাশিদুল হাসান। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তার পচারণা। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সিসটেক ডিজিটাল জাপান ইনক, সিসটেক ডিজিটাল ইউকে লিমিটেড এর মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। ২০ বছরেরও অধিক সময় ধরে তিনি বেসিসের বাইরে এবং ভিতরে থেকে ইন্ডাস্ট্রি উন্নয়নে সময় দিচ্ছেন। বেসিসে তিনি জয়েন্ট সেক্রেটারি জেনারেল, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্টসহ বিভিন্ন পদে একাধিক মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন। আইটি রপ্তানিতে ক্যাশ ইনসেনটিভ এবং কর অব্যাহতি প্রবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্লকচেইন, আইওটি এবং ক্লাউড কম্পিউটিং-এর মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে মনোনিবেশ করছেন এবং বাংলাদেশের ২,৬০০+ তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করার জন্য কাজ করছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেসিস সংস্কারের গুরুভার নিয়ে জ্যেষ্ঠ সহ সভাপতি থেকে মনোনীত হলেন সভাপতি। নতুন দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই মুখোমুখি হন ডিজিবাংলাটেক.নিউজ-এর। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ইমদাদুল হক।
প্রশ্ন : বেসিস একটি বাণিজ্যিক সংগঠন। বাণিজিক প্রতিষ্ঠান নয়। তারপরও সাম্প্রতিক সময়ে এই নেতৃত্বে আসতে এবং আঁকড়ে থাকতে এক ধরনের যুদ্ধেংদেহী মনোভাব দেখা যাচ্ছে। কেন এমনটা হচ্ছে বলে মনে করেন?
ভবিষ্যতের পৃথিবী - তথ্য প্রযুক্তির পৃথিবী। আজকের মেধাবী তরুণ উদ্যোক্তাদের অসাধারণ সব উদ্যোগের ফসল হবে আমাদের ভবিষ্যৎ। সেই হিসেবে, তথ্য প্রযুক্তি ব্যবসায়ীদের প্রধান সংগঠন হিসেবে বেসিসের নেতৃত্বে অনেকের আসার আকাঙ্ক্ষা থাকবে - এটাই স্বাভাবিক। আমরা বরং বাংলাদেশের আইসিটি শিল্পের উন্নয়নে এতো মানুষের অবদান রাখতে চাওয়ার ইচ্ছাকে সম্মান জানাই। যৌক্তিক সমালোচনা নেতৃত্বকে আরো বলিষ্ঠ করে তোলে। আমরা সংগঠনের ভেতর ভিন্নমতকে স্পোর্টিং স্পিরিটে দেখি। সবার উদেশ্য একটাই - বৈশ্বিক আইসিটি শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নয়ন এবং দেশে-বিদেশে ব্যবসার প্রসার ঘটানো।
প্রশ্ন: ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংগঠনের সদস্যরা যখন বিভিক্তিতে হাবুডুবু খাচ্ছেন তখন পুনর্বিন্যাসিত বেসিস কার্য নির্বাহী কমিটির শীর্ষ দায়িত্ব বর্তালো আপনার ওপর। এই দায়িত্বকে কীভাবে মূল্যায়ণ করছেন?
বিগত ১৫-২০ বছরে বেসিসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করার কারণে সংগঠনটি সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাকে কিছুটা সুবিধা দেবে। বিভক্তি অথবা অযৌক্তিক সমালোচনা কখনোই কাম্য নয়। দেখুন আমাদের আইসিটি শিল্পে বর্তমানে ৩.৫ লক্ষ এর অধিক মানুষ কাজ করছে যাদের পেছনে বছরে প্রায় ৯০০০ কোটি টাকার বেতন আমাদের মেম্বার ব্যবসায়ীরা ব্যয় করছে। আমাদের পেছনে যাবার কোনো সুযোগ নেই। সামনের দিনগুলো ভালো করবার জন্য আমাদের প্রয়োজনীয় সংস্কারটুক আমরা করতে চাই। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে ব্যবসায়ীরা অনেকখানি ক্ষতিগ্রস্ত ও অনিরাপদ বোধ করছে। বাজারে চাহিদা কম থাকায় কম বেশি সবাই বেশ সংকটময় সময় পার করছে। এই মুহুর্তে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে কিভাবে ব্যবসার সার্বিক পরিস্থিতি ভালো করা যায় সেই বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে দেখতে চাই।
প্রশ্ন: নির্বাচনকে সামনে রেখে মেম্বার্স ম্যাটার্স কিংবা এক সাথে এক পথে ইত্যাদি স্লোগান শোনা যায়। এগুলো বাস্তবায়ন কতটা হয়? বাস্তবায়নে আপনার পরিকল্পনেই বা কি?
নির্বাচনে প্রতিটি প্রার্থী নিজের অঙ্গীকার এবং প্লানগুলো তার ভোটার অর্থাৎ মেম্বারদের কাছে তুলে ধরবে - এটাই বাস্তব। স্বপ্ন দেখলে কিন্তু বড় স্বপ্নই দেখা উচিত। আমরা মনে করি - বেসিসের সকল মেম্বার একসাথে, এক লক্ষ্যে যাত্রা করছে। এই যাত্রা কখনো শেষ হবে না। কারণ, সাফল্যগুলো যাত্রা পথে স্টপেজের মতো। এখন সময় দেশীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বজয়ের। আমাদের কোম্পানিগুলো বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করবে। কিন্তু বাজারে আপনার দোকানই যদি না থাকে তাহলে আপনার কাছ থেকে কিনবে কে? আমরা সেই বাজারে দোকান খুলতে চাই। বাংলাদেশি আইসিটি কোম্পানির বিদেশী সাবসিডিয়ারি খুলতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধিনিষেধ রয়েছে। আমরা এর পরিবর্তন চাই। আমাদের সকল দাবি মেম্বারদের জন্যই। সুতরাং মেম্বার ম্যটার না করলে এই দাবিগুলো নিয়ে কিন্তু কাজ করা হতো না। সুতরাং আপনার প্রশ্নের জবাব লুকিয়ে আছে আমাদের কাজের ভেতর।
প্রশ্ন: সংস্কারের যে গুরু দায়িত্ব পড়েছে আগামী ছয় মাসের মধ্যে কি প্রতিশ্রুত ৫ সংস্কার সম্পন্ন করতে সক্ষম হবেন? কীভাবে সংস্কারটা বাস্তবায়ন করবেন?
সংবিধান সংশোধন, মেম্বার অডিট, মেম্বার সুরক্ষা এবং পলিসি রিফরম এই বিষয়গুলো আমাদের সংস্কারের অথবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মূল ভিত্তি। আমরা প্রতিটি বিষয়ে প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের নেতৃত্বে বিশেষায়িত কমিটি করে দিচ্ছি। গত জুনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক অগাস্ট থেকে আমাদের সংবিধান সংশোধন কমিটি কাজ করছে। আমাদের সম্মানিত দুইজন প্রাক্তন সভাপতি এবং প্রাক্তন কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্যগণ এই দায়িত্বে আছেন। প্রয়োজনবোধে আমরা কমিটি পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করতে পারি। ঠিক একই ভাবে অত্যন্ত দ্রুত আমরা বাকি কমিটিগুলো তৈরি করে দেবো যাদের প্রস্তাবনাগুলো আমরা জানুয়ারির এজিএম এ তুলে ধরবো। মেম্বারদের সম্মতিসাপেক্ষে আমরা প্রস্তাবগুলো পাশ করে নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে এগিয়ে যাবো। একই সাথে আমরা ছোটো পরিসরে মেম্বার মিটাআপ করে চলমান বিষয়ে অগ্রগতি তুলে ধরবো।
প্রশ্ন: সভাপতির পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে পুরো কার্য নির্বাহী কমিটিকে যখন একটি অংশ পদত্যাগের দাবি তুললো, তখন ই-ভোটের আয়োজন করলেন। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হয়েওই এই ই-ভোটে মাত্র ২২ শতাংশের মতো ভোট পড়লো। বিষয়টি কিভাবে দেখছেন?
আমরা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সকলকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। এই কমিটির মেয়াদ আছে আরো ১৮ মাস। কিন্তু দেখুন, আমরা কিন্তু মাত্র ৬ মাসের মাথায় আগাম নির্বাচন করতে চাই। নীতিগতভাবে আমরা অধিকাংশের ঐকমতের ভিত্তিতে আমাদের কর্মপন্থা নির্ধারণ করছি। ৪৮ ঘন্টার কম সময়ে বিনা নোটিশে করা এই পোলিং এর মাধ্যমে আমরা মেম্বারদের পালস বোঝার চেষ্টা করেছি। বিষয়টি নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলতেই পারে কিন্তু আমাদের বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়ে আগাতে হবে।
প্রশ্ন: বেসিস যত বড় হচ্ছে সদস্যদের মধ্যে ততোই বিভেদ-বিদ্বেশ প্রকাশ্যে আসছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী সবাই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে কি কুণ্ঠিত? এটা কি সদস্য পদ দেয়ার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে না?
আমরা সদস্যদের কাছে ব্যবসায়ীসুলভ আচরণ আশা করি। আমরা কিন্তু সবাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিক। আমরা যদি ব্যক্তিস্বার্থের চাইতে গোষ্ঠীস্বার্থকে প্রাধান্য দিতে না পারি তাহলে আমাদের শিল্প বড় হবে না। অন্যায়কে প্রতিহত এবং সমালোচনা যেরকম আবশ্যক, ঠিক একই ভাবে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আরেকজন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ভুয়া মামলা করা, ব্যক্তিগত আক্রমণ করা, মিথ্যা অভিযোগ তোলা একদমই ঘৃণ্য কাজ। আমাদের তরুণ উদ্যোক্তা সদস্যদের আমরা অনুপ্রাণিত করতে চাই এক সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নিয়ে। বেসিস সবসময় সম্ভাবনার কথা বলে।







